الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى أَفْضَلِ الْمُرْسَلِينَ مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ الطَّيِّبِينَ الطَّاهِرِينَ، وَبَعْدُ:
মূল ইবারত ও মতন (المتن) — ইবারত দেখতে ক্লিক করুন
শব্দার্থ দেখতে যেকোনো আরবি শব্দের ওপর আলতো ট্যাপ/ক্লিক করুন।
আজকের দরসের মূল আলোচ্য বিষয়:
আজকের পাঠে কাফিয়া কিতাবের সূচনাপর্বের তিনটি অতীব মৌলিক ও তাহকীকী বিষয় আলোচনা করা হয়েছে:
- গ্রন্থকার কর্তৃক কিতাবের শুরুতে بِسْمِ اللَّهِ আনার কারণ।
- الْكَلَام-এর পূর্বে الْكَلِمَة-কে কেন প্রাধান্য (مُقَدَّم) দেওয়া হলো?
- الف لام-এর প্রকারভেদ ও তার বিস্তারিত ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ।
প্রথম বিষয়: কিতাব ‘بسم الله’ দিয়ে শুরু করার কারণ
নাহব শাস্ত্রের সুবিখ্যাত ইমাম, আল্লামা ইবনুল হাজিব (رحمه الله) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ কাফিয়া «بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ» দ্বারা শুরু করেছেন মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণে:
১. ইকতিদা বিল কুরআন (اِقْتِدَاءٌ بِالْقُرْآنِ):
পবিত্র কুরআনের সূচনা হয়েছে বিসমিল্লাহ দ্বারা। মহান আল্লাহর পবিত্র কিতাবের ধারাক্রম অনুসরণে তিনি কিতাবের শুরুতে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছেন।
২. ইকতিদা বিল হাদিস আশ-শারীফ (اِقْتِدَاءٌ بِالْحَدِيثِ الشَّرِيفِ):
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
(অর্থ: প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা ‘বিসমিল্লাহ’ দ্বারা শুরু করা হয় না, তা বরকতহীন ও অসম্পূর্ণ।)
সুতরাং, এই হাদীসের ওপর আমল করার উদ্দেশ্যেই তিনি এটি এনেছেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র সুন্নাহ ছিল—তিনি যখনই কোনো পত্র লিখতেন (যেমন: হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্র ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে প্রেরিত দাওয়াতনামা), তখন শুরুতেই ‘বিসমিল্লাহ’ লিখতেন।
৩. ইকতিদা বিস-সালাফিস সালিহীন (اِقْتِدَاءٌ بِالسَّلَفِ الصَّالِحِينَ):
একটি প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে: «الْخَيْرُ مَعَ أَكَابِرِكُمْ»। পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম ও বুজুর্গগণ তাঁদের কিতাবসমূহ বিসমিল্লাহ দ্বারাই শুরু করতেন। তাই গ্রন্থকারও তাঁদের অনুসরণ করেছেন।
একটি সূক্ষ্ম আপত্তি (إِشْكَال) ও তার তাহকীকী সমাধান (جَوَاب):
আপত্তি: গ্রন্থকার যদি কুরআন ও হাদীসের পূর্ণ অনুসরণ করতে চাইতেন, তবে তিনি ‘বিসমিল্লাহ’-এর পর «الْحَمْدُ لِلَّهِ» কিতাবে কেন লিখলেন না? কারণ কুরআনের শুরুতে বিসমিল্লাহর পর আলহামদুলিল্লাহ রয়েছে এবং হাদীসের অপর বর্ণনায় এসেছে: «كُلُّ أَمْرٍ ذِي بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِحَمْدِ اللَّهِ فَهُوَ أَبْتَرُ»।
সমাধান:
- গ্রন্থকার মূলত কুরআন অবতীর্ণের ধারাক্রম (اِبْتِدَاءٌ نُزُولِيٌّ - ইবতিদায়ে নুযূলী)-এর অনুসরণ করেছেন। কারণ সর্বপ্রথম অবতীর্ণ ওহীতে (সূরা আলাক্ব) ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ছিল না।
- হাদীসের নির্দেশটি আমলগত দিক থেকে ব্যাপক। তা লেখনীর মাধ্যমে (رَسْمًا), মৌখিক উচ্চারণে (قَوْلًا) কিংবা মনে পড়ার মাধ্যমেও বাস্তবায়িত হতে পারে। গ্রন্থকার কিতাবে তা লিপিবদ্ধ না করলেও মুখে পড়ার মাধ্যমে এই আমল সম্পন্ন করেছেন।
দ্বিতীয় বিষয়: ‘কালাম’-এর পূর্বে ‘কালিমাহ’-কে কেন আনা হলো?
আল্লামা ইবনুল হাজিব (رحمه الله) দীর্ঘ ভূমিকা পরিহার করে সরাসরি ইলমে নাহুর মূল আলোচ্য বিষয় الْكَلِمَة এবং الْكَلَام দিয়ে কিতাব শুরু করেছেন।
অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তিগত কারণ:
الْكَلِمَةُ হলো مُفْرَدٌ এবং الْكَلَامُ হলো مُرَكَّبٌ। যুক্তি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হলো—যৌগিক বা মিশ্রিত কোনো কিছু গঠিত হওয়ার পূর্বে তার মৌলিক একক অংশটির অস্তিত্ব থাকতে হয়। অর্থাৎ مُفْرَدَات সমন্বয়েই مُرَكَّب তৈরি হয়। তাই স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী الْمُفْرَد (الْكَلِمَة)-কে الْمُرَكَّب (الْكَلَام)-এর পূর্বে স্থান দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় বিষয়: الف لام (আলিফ-লাম)-এর প্রকারভেদ
আরবি ব্যাকরণে الْ (আলিফ-লাম) মৌলিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত:
├── ১. اِسْمِيّ (ইসমী)
└── ২. حَرْفِيّ (হারফী)
১. الف لام اسمی (আলিফ-লাম ইসমী):
যে আলিফ-লাম اِسْمُ فَاعِلٍ এবং اِسْمُ مَفْعُولٍ-এর সীগাহর শুরুতে যুক্ত হয়।
যেমন: الضَّارِبُ এবং الْمَضْرُوبُ।
নাহবী বিধান: এই আলিফ-লামটি মূলত হরফ নয়, বরং এটি اِسْمُ مَوْصُولٍ (যেমন: الَّذِي)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়।
২. الف لام حرفی (আলিফ-লাম হারফী):
‘ইসমী’ ব্যতীত আরবি ভাষার অন্য সমস্ত আলিফ-লামকে ‘হারফী’ বলা হয়। এটি পুনরায় দুই ভাগে বিভক্ত:
- زَائِدَة (যাইদাহ / অতিরিক্ত)
- غَيْرُ زَائِدَةٍ (গায়রে যাইদাহ / অর্থবহ)
(ক) الف لام زائد (আলিফ-লাম যাইদাহ):
যে আলিফ-লামকে শব্দ থেকে বাদ দিলেও মূল উদ্দিষ্ট অর্থে কোনো বিকৃতি বা ত্রুটি ঘটে না।
হযরত আলী (رضي الله عنه)-এর অমর কবিতা থেকে দলিল:
(অর্থ: আমি এমন এক নীচ ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করি যে আমাকে গালি দেয়, কিন্তু আমি সেখান থেকে সোজা চলে যাই এবং ভাবি—সে আমাকে উদ্দেশ্য করে গালি দিচ্ছে না।)
নাহবী তাহকীক:
এখানে اللَّئِيمِ শব্দের ‘আলিফ-লাম’টি হলো زَائِد। কারণ তার পরবর্তী বাক্য «يَسُبُّنِي» হলো তার صِفَت। কায়েদা অনুযায়ী جملة যখন صفت হয়, তখন তা হুকুমের দিক থেকে نَكِرَة হয়। মাওসূফ ও সিফাতের মিল রক্ষার জন্য اللَّئِيمِ শব্দটিও প্রকৃতপক্ষে نكرة; সুতরাং এর আলিফ-লামটি অতিরিক্ত।
(খ) الف لام غیر زائد (আলিফ-লাম গায়রে যাইদাহ):
যে আলিফ-লাম শব্দ থেকে বাদ দিলে বাক্যের মূল অর্থে পরিবর্তন বা ত্রুটি দেখা দেয়।
উদাহরণ: «الرَّجُلُ قَائِمٌ»। এখানে الرَّجُلُ হলো মুবতাদা এবং قَائِمٌ হলো খবর। আলিফ-লাম বাদ দিলে এটি বাক্য না হয়ে মাওসূফ-সিফাত (একটি দাঁড়ানো লোক) হয়ে যাবে।
الف لام غیر زائد (আলিফ-লাম গায়রে যাইদাহ)-এর ৪টি প্রকার:
├── ১. جِنْسِيّ (জিনসী)
├── ২. اِسْتِغْرَاقِيّ (ইস্তিগরাক্বী)
├── ৩. عَهْد ذِهْنِيّ (‘আহদে যিহনী)
└── ৪. عَهْد خَارِجِيّ (‘আহদে খারিজী)
১. الف لام جنسی (আলিফ-লাম জিনসী):
যা দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নয়, বরং কোনো সত্তার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য ও মূল জাতি (مَاهِيَّت) বোঝানো হয়।
উদাহরণ: «الرَّجُلُ خَيْرٌ مِنَ الْمَرْأَةِ» (পুরুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্য সামগ্রিকভাবে নারী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ)।
২. الف لام استغراقی (আলিফ-লাম ইস্তিগরাক্বী):
উক্ত শব্দের আওতাধীন সকল ব্যক্তিকে (تَمَام أَفْرَاد) সামগ্রিকভাবে বেষ্টন করার জন্য যে আলিফ-লাম আসে।
পবিত্র কুরআনের আয়াত:
(এখানে ‘আল-ইনসান’ শব্দের আলিফ-লাম দ্বারা পৃথিবীর সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।)
৩. الف لام عہد ذہنی (আলিফ-লাম ‘আহদে যিহনী):
যে আলিফ-লাম দ্বারা এমন কোনো অনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু উদ্দেশ্য হয়, যা কেবল বক্তা (مُتَكَلِّم)-এর মনের মধ্যে নির্দিষ্ট, কিন্তু শ্রোতা (سَامِع)-এর কাছে অনির্দিষ্ট।
পবিত্র কুরআনের আয়াত (হযরত ইয়াকূব আ.-এর বক্তব্য):
(এখানে ‘আয-যিব’ দ্বারা কোনো পরিচিত নেকড়ে নয়, বরং যেকোনো সাধারণ অনির্দিষ্ট নেকড়ে উদ্দেশ্য।)
৪. الف لام عہد خارجی (আলিফ-লাম ‘আহদে খারিজী):
যে আলিফ-লাম দ্বারা এমন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু উদ্দেশ্য হয়, যা বাস্তব জগতে বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের নিকট পূর্ব থেকেই সুস্পষ্ট ও পরিচিত।
পবিত্র কুরআনের আয়াত:
(এখানে ‘আর-রাসূল’ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে হযরত মূসা আ.-কে বোঝানো হয়েছে, যা উভয়ের জানা।)
পুরো পাঠের সারসংক্ষেপ (خلاصہ درس)
- কিতাবের শুরুতে بِسْمِ اللَّهِ আনার ৩টি কারণ: কুরআন, হাদীস ও সালাফে সালেহীনের অনুসরণ।
- الْكَلِمَة হলো মৌলিক একক (مُفْرَد), আর الْكَلَام হলো সমষ্টি (مُرَكَّب)। যৌগিকের পূর্বে একক আসে বলেই কালিমাহ আগে আনা হয়েছে।
- الف لام প্রধানত ২ প্রকার: اسمی ও حرفی।
- حرفی আলিফ-লাম ২ প্রকার: زائد ও غیر زائد।
- غیر زائد সর্বমোট ৪ প্রকার:
- جنسی (জিনসী)
- استغراقی (ইস্তিগরাক্বী)
- عہد ذہنی (‘আহদে যিহনী)
- عہد خارجی (‘আহদে খারিজী)।